কিভাবে তুর্কির ইতিহাস হয়ে দাঁড়ালো কামালের ইতিহাস?কথিত আধুনিক তুরস্কের জনক কামাল আতাতুর্ক যেভাবে তুরস্ককে নাস্তিকায়ন করেনঃ
১৯১৮ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ যখন থামল ততক্ষনে উসমানীয় খিলাফাহ দক্ষিণ দিকে ব্রিটিশ , পূর্বে রুশ আর পশ্চিমে গ্রিকদের মাঝে বিলিবন্টন হয়ে গেছে। মধ্যখানের আনাতোলিয়ান অঞ্চল টিকে গেল মুস্তাফা কামাল পাশা নামের এক সফল উসমানীয় আর্মি অফিসারের নেতৃত্বে।
তবে কামাল মনে করতেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের কারণ হচ্ছে ইসলাম। অতীত দুর্ভাগ্যের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করতে হলে ইসলামের সাথেও সম্পর্কচ্ছেদ করতে হবে!!
যারা পরাজিত করল , কাঙালের মত তাদের সব মৌলিক ধ্যানধারণা ও জীবনাচরণ গ্রহণ করে নিতে হবে। এ যেন কালো মানুষের’ ‘সাদা’ হয়ে ওঠার উদগ্র বাসনা। তাই তিনি উসমানীয় খেলাফতের বহু বিচিত্র জাতিগোষ্ঠীর গৌরব ভুলে একরোখা তুর্কি জাতীয়তাবাদের ঝান্ডা উড়িয়ে দিলেন।
কামাল পাশা উসমানীয় খলিফা আব্দুল মজিদকে ক্যু’র মাধ্যমে উৎখাত করলেন। ব্যাপারটা সারা মুসলিম জাহানে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া তৈরি করল।
১২৯৯ সাল থেকে চলে আসা মুসলিম জাহান বিস্তৃত উসমানীয় খিলাফাতের সাথে কলোনিয়াল সাম্রাজ্যবাদের তফাৎটা হল, এই খিলাফাত কখনও জোর-জবরদস্তি করে খিলাফতের নিয়ন্ত্রাণাধীন অঞ্চল থেকে সম্পদ লুট করে কেন্দ্রে পাঠায়নি অথবা কেন্দ্রের শিল্পায়নের সুবিধার্থে সীমান্তে জুলুমের নীলকর এর জন্ম দেয়নি।
এই কল্যাণময়ী খিলাফাতের মৃত্যুযাত্রা দেখে মুসলিম মনন ও হৃদয় হুঁহুঁ করে কেঁদে উঠেছিল সেদিন। তাই তো সেদিন এই উপমহাদেশেও আমাদের বাপ-
দাদা-পরদাদারা রাস্তায় নেমে এসেছিলেন ‘খিলাফাত আন্দোলনের’ জন্য।
খলিফা দ্বিতীয় আব্দুল মজিদ হিন্দ-এর মুসলমানদের কাছে একজন দূত
পাঠিয়েছিলেন সবকিছু ওয়াকিবহাল করতে। আর সেই দূত অন্য কেউ নন , তিনি হচ্ছেন প্যান ইসলামিজমের প্রাণপুরুষ কিংবদন্তী জামালুদ্দীন
আফগানী।
তুর্কি জাতির এত বড় নেয়ামত খিলাফাত কামাল পাশার সহ্য হলো না। তুর্কির ‘অভ্যন্তরীণ’বিষয়ে ‘বহিরাগত’দের হস্তক্ষেপের ধোঁয়া তুলে খিলাফাতকে পুরোপুরি বিলুপ্ত করে খলিফার পরিবারকে পত্রপাঠ বিদায় দিলেন কামাল।
তারপর আঘাত করলেন ইসলামের উপর-ইসলাম তাড়ানোর প্রজেক্ট প্রথমে শুরু হয়েছিল ‘ইসলামের উপর থেকে রাজনৈতিক প্রভাব দূর করো’ এই নামে। এরপর তুর্কির সবগুলো মাদ্রাসা বন্ধ করা হল।
সেক্যুলার ও ‘নন-ডগম্যাটিক’চিন্তাধারার পড়াশোনা চালু করতে অন্য সকল ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও বন্ধ করা হলো।
* জাতীয় অ্যাসেম্বলির আইন বিশ্লেষণের জন্য তৈরি শরীয়াহ
কাউন্সিল ভেঙ্গে দেওয়া হলো।
* সুবিশাল ওয়াকফ (ইসলামী দানে পরিচালিত আজীবনের ফাউন্ডেশন)
অর্থনীতি গুঁড়িয়ে দেওয়া হল।
* সুফী খানকাগুলো জোর করে উচ্ছেদ করা হলো।
* সকল কাজী’র (শরীয়াহ কোর্টের বিচারক) চাকরি বাতিল ও শরীয়াহ কোর্ট বাজেয়াপ্ত করা হলো। ব্যক্তিগত জীবনে হস্তক্ষেপ না করার ব্যাপারে পশ্চিমা আলোকায়নের একটা বড়াই বরাবরই আছে। কিন্তু সেই আলোকায়নের স্বঘোষিত রুহানী সন্তান মুস্তাফা কামাল ব্যক্তিগত জীবনে ইসলাম পালনটা মেনে নিতে পারছিলেন না। তাই তিনি এই কর্মসূচি ঘোষণা করলেন।
* পুরুষদের জন্য ইসলামী অতীত মনে করিয়ে দেয় এমন পোশাক, যেমন ফেজ টুপি বা পাগড়ি,নিষিদ্ধ হলো; পশ্চিমা হ্যাট বাধ্যতামূলক হলো।
* নারীদের গৌরব হিজাব নিয়ে হাসি-তামাশা করা শুরু হলো এবং পাবলিক
প্লেসে হিজাব নিষিদ্ধ করা হলো।
* রাসুলুল্লাহ (সা)-এর হিজরত থেকে প্রচলিতহিজরি ক্যালেন্ডার বাতিল
করে ‘যীশু খ্রিস্টের’ জন্মের উপর ভিত্তি করে শুরু গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার চালু হলো।
* ১৯৩২ সালে আরবিতে আজান দেওয়া বন্ধ করা হলো এবং তুর্কির হাজার হাজার মসজিদে তুর্কি ভাষায় আজান বাধ্যতামূলক করা হলো।
* শুক্রবারের সাপ্তাহিক ছুটি বাতিল করে শনি-রবিবারের ইউরোপীয় ছুটি চালু হলো।
* তুর্কি ভাষা থেকে আরবি হরফ বাতিল করে ল্যাটিন হরফ চালু করেন।
* এই সব কাহিনী বাস্তবায়ন শেষে , জাতীয় অ্যাসেম্বলি শরীয়াহ মেনে চলার যে ঢং শুরুতে করেছিল তাও খোলাখুলিভাবে ঝেড়ে ফেলে দিল এবং কামালের সেক্যুলার দর্শন দিয়ে ইসলামকে প্রতিস্থাপিত করা হলো।
কামাল জাতীয়তাবাদকে কত গুরুত্বপূর্ন মনে করতেন আর ইসলামকে কতটা ফালতু মনে করতেন সেটা তার নিজের ভাষায় এ রকম:
“আরবদের ধর্ম (ইসলাম) গ্রহণ করার আগে থেকেই তুর্কিরা একটা মহান জাতি হিসাবে হাজির ছিল। আরবদের ধর্ম গ্রহণ করার পর , এই ধর্ম আরব , ইরানী , মিশরীদের সাথে তুর্কিদের মিলিয়ে একটা একক জাতি বানিয়ে দিতে পারেনি বরং এই ধর্মটা তুর্কি জাতির বন্ধনকে শিথিল করেছে আর জাতীয় উদ্দীপনাকে করেছে ভোঁতা।
এটাই হওয়ার কথা ছিল। কারণ মুহাম্মাদ যে ধর্ম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সেটার উদ্দেশ্যই ছিল অপরাপর জাতির উপর আরবের জাতীয় রাজনীতি চাপিয়ে দেওয়া।” [মুস্তাফা কামাল , সভ্যতার কথা (Medenî Bilgiler)]
*এরপর কামাল তরুণদের কাছে অতীতকে পাঠ-অনুপোযোগী করে তুললেন।
ফার্সি ও উর্দুর মত তুর্কি ভাষাও আরবি হরফেই লেখা হতো। তুর্কি ভাষায় বহু আরবি শব্দের মিশেল ছিল। ফলে তুর্কিরা খুব সহজেই আরবি ভাষার ইসলামী সাহিত্যপড়তে পারতেন। কামাল আরবি হরফ নিষিদ্ধ করে দিলেন।
একটা নতুন কমিশন করে দিলেন যাদের একমাত্র কাজ ছিল অনুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে আরবি ও অন্যান্য ভাষা , যেমন ফার্সি , থেকে আসা শব্দ খুঁজে তা বাদ দিয়ে তুর্কি ভাষাকে ‘বিশুদ্ধ’ করা।
ফলে নতুন প্রজন্ম যে ভাষায় শিক্ষা ও দাপ্তরিক কাজে অভ্যস্ত হয়ে উঠলো, তা ঠিক আগের প্রজন্ম থেকে বহুমাত্রায় ভিন্ন। নতুন ল্যাটিন হরফের লেখাই হলো কামাল পাশার কাছে সহনীয়। ফলে তুর্কির ইতিহাস হয়ে দাঁড়ালো কামালের ইতিহাস।
এক নতুন জেনারেশন তৈরি হলো, যাদের
সাথে শিকড়ের কোনো যোগ নেই। চল্লিশ-পঞ্চাশের দশকে এমনও সময় গেছে যখন তুর্কি শিশু, কিশোর, যুবা জানত না ওযু বা গোসল কীভাবে করতে হয়।